Ador Shodesh

Ador Shodesh is an unique style Bengali font. This font is available for Unicode. You can use it in anywhere, specially for making logo, posters, magazines, banners and etc.
Author Notes : This is free font for Personal, Commercial and all type of usage. You can use it in anywhere.
Font Details
Type:Unicode
Designer:Nurul Alam Ador
Styles:1
Published:26 March 2019
Downloaded:



    |     Font Size  
Ador Shodesh
আমার সোনার বাংলা
ছোটো গল্পঃ- দীর্ঘশ্বাস
ঝুম বৃষ্টি। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ নিয়ে দোতালার বারান্দায় বসে আছেন পঞ্চাশোর্ধ মিসেস মীরা খান।কোলে পরে আছে রবী ঠাকুরের 'গীতাঞ্জলী '; শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছেন বাইরে।না পড়ছেন বই, না চুমুক দিচ্ছেন কফির মগে। আজকে তার মন খারাপ, ভীষণ মন খারাপ। ছোট মেয়েটাকে ফোন দিয়েছিলেন একটু আগে, ফোন ধরেই সে 'মা, ব্যস্ত আছি; পরে কল দেব' বলে খট করে ফোন কেটে দিয়েছে। তিনি এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না, কেন ঝুমু এমন করল! হ্যাঁ,ঝুমু; তার ছোট মেয়ে। বড় জন হল রুনু আর ছেলে শান্ত।
চট্টগ্রাম শহরের সদরে দ্বিতল এই বাড়িটির দোতালার এই ফ্লাটে স্বামী মারা যাবার পর থেকে বলতে গেলে একাই থাকেন তিনি। তিন ছেলে-মেয়েই প্রতিষ্ঠিত, যার যার কর্মস্থানে সেটেলড। নিচতলা আর দোতালার অন্য ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। বকুলের মা নামের এক মহিলা এসে গৃহস্থালি সব কাজ আর রান্নাবান্না করে দিয়ে যায়। তিনি স্বামী-সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে অলস সময় কাটান।
ছাত্রী জীবনে খুব ভাল ছাত্রী ছিলেন মীরা। তার মা খুব একটা শিক্ষিত না হলেও বাবা ছিলেন হাইস্কুলের হেডমাস্টার। বাবার উৎসাহেই উচ্চশিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন মীরা। জীবন গড়ার প্রস্তুতিও সেভাবেই নেন। সেই যুগে মেয়েদের লেখাপড়া প্রাইমারি স্কুল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বাবার সাহায্যে আর অনুপ্রেরণায় তিনি চারটা লেটার সহ মেট্রিক পাস করেন। মা-বাবার খুশির অন্ত থাকে না। কিন্তু আশেপাশের মানুষ এবার কানাঘুষা শুরু করে, মেয়ে তো অনেক বড় হলো, বিয়ে দিবে কবে! মীরার বাবা ব্যক্তিজীবনে ভীষণ সৎ মানুষ ছিলেন। তাই মানুষ বিচারে তিনি শিক্ষা ও বংশমর্যাদার চেয়ে সততাকেই গুরুত্ব দিতেন বেশি। একদিন তিনি খুব সাধারণ দেখতে এক ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। মীরাকে ডেকে বলেন,মা, যেই ছেলে ওজনে কম হওয়ার ভয়ে নিজের মুদিদোকানের পালা পাথর প্রতি বছর পালটিয়ে নতুন পাথর নেয়, তার মত সৎ ও ভাল ছেলে সারা জীবন খুঁজলেও পাবি না তুই। এই ছেলেকে নিয়ে তুই খুব সুখী হবি মা, আমার ইচ্ছাটা পূরণ কর।
বাবার কথার উপর কথা বলার সাহস বা ইচ্ছা- কোনোটাই মীরার ছিল না। তাইতো মেট্রিকে লেটার পাওয়া উচ্চশিক্ষার স্বপ্নবিলাসী মেয়েটি বাবার কথায় মেট্রিক ফেইল, সাদাসিধে মুদিদোকানের মালিক শাহেদ নামের ছেলেটিকে বিয়ে করে ফেলে। না! মীরা সেদিন ভুল করেনি। শাহেদ খুব ভাল রেখেছে মীরাকে। খুব দামী কিছু দিতে না পারলেও প্রতি জন্মদিনে রবী ঠাকুরের বই আর বেলীফুলের মালা দিতে কখনও মিস করেনি সে। চাঁদনি রাতে ছাদে সারারাত গল্প করা, শেষ বিকেলে ফুচকা খেতে যাওয়া,ঝুম বৃষ্টিতে ভেজা- তীব্র ভালবাসায় ডুবে থেকে কিভাবে যে দশটি বছর কেটে গেল বুঝতেই পারেনি মীরা!
তখন সে তিন সন্তানের মা। রুনুর সাত বছর, ঝুমুর চার আর শান্তর মাত্র এগারো মাস বয়স। শাহেদ প্রতিদিনের মত সকালে নাস্তা করে দোকানের কাজে বেরিয়ে গিয়েছে। দুপুরের খাবারের সময়ই ফিরে আসার কথা। প্রতিদিন তাই ই আসে। কিন্তু সেদিন দুপুরে আর খেতে এলো না মানুষটা। হয়ত কোনো কাজে আটকে গিয়েছে। দুপুর পেরিয়ে বিকেল,তারপর সন্ধ্যা।এখনও আসেনি শাহেদ। অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে মীরার। এমন তো কখনও হয় না! তারপর আরও পরে,রাত ১০:০০ টার দিকে এলো শাহেদ। না, শাহেদ বলাটা ঠিক হচ্ছে না; আসলে এসেছে শাহেদের লাশ! একটা রোড এক্সিডেন্ট মীরার ১০ বছরের সাজানো সংসার ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ভেঙ্গে তছনছ করে দিল। ছোট ছোট তিন সন্তানকে নিয়ে অথৈজলে পরল মীরা।
ভেঙ্গে পরলে চলবে না, টিকে তো থাকতে হবে। একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে নেয় মীরা। স্কুল টাইমের পর সে কয়েকটি টিউশনি করিয়ে সেই টাকা দিয়ে বহু কষ্টে তিন সন্তানকে বড় করে তোলে, উচ্চশিক্ষিত বানায়। রুনু ইঞ্জিনিয়ার, বিয়েও করেছে এক ইঞ্জিনিয়ারকেই; নিজের ক্লাসমেট। দুজনই স্কলারশিপ নিয়ে জাপানে সেই যে গেল, আর কখনও আসার নাম করেনি। মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে মায়ের একটু খোঁজ নেয়, এই যা।শান্ত পেশায় একজন আর্টিস্ট। ঢাকায় একটা প্রাউভেট ভার্সিটির চারুকলা ডিপার্টমেন্টের ডীন। বউ নিয়ে সে ঢাকায়ই সেটেলড। সেও মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে খোঁজ নেয় বটে মায়ের, কিন্তু কখনও মা'কে নিয়ে যেতে চায় না নিজের কাছে এমনকি বেড়াতে যেতেও বলে না। শান্ত আসে মা'কে দেখতে, এই বছরে এক কি দুইবার। তবে বউকে আনতে পারে না এখানে। নাক উঁচু বউয়ের কাছে এই শাশুড়ির খোঁজ নেওয়াটা ওল্ড কালচার মনে হয়। আর ছোট টা হল ঝুমু। বড্ড বদমেজাজি। একটা আইটি ফার্মের মালিক সে এখন। বিয়ে করেনি। আগে ক্যারিয়ার গড়বে,তারপর বিয়ের কথা ভাববে। সে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে এতটাই সচেতন যে মা'কে ফোন করার সময়টুকুও পায় না।
বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মীরার। এই এরা তার সন্তান। এদের জন্য সে তার সারাটা জীবন খেটে কষ্ট করে, নিজের সব শখ- আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে মানুষ করেছে ভাবতেই নিজেকে খুব ব্যর্থ মানুষ মনে হয় তার। এক সময় সে খুব গর্ব করত এই ভেবে যে, সে নিজের তিন সন্তানকেই সুশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে, নিজেকে বড্ড সফল মানুষ মনে হত। কিন্তু আজকে মনে হচ্ছে তার মত ব্যর্থ মানুষ দুনিয়ায় কমই আছে। একটা ছোট্ট ঘরে তিনটা বাচ্চাকে তিনি নিজে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছিলেন। আজ সেই তিনজনের তিনটা আলাদা ফ্ল্যাট হয়েছে, কিন্তু সেই তিনটা ফ্ল্যাটের কোনো একটা রুম তার জন্য বরাদ্দ করতে পারেনি তারা।
মাঝে মাঝে স্কুল জীবনের কথা খুব মনে পরে মীরার। পড়ালেখা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, লেখালিখি, স্কাউট,সভা,মিছিল,র্যালি- সব জায়গায় দাপিয়ে বেরিয়েছেন তিনি। নানা সচেতনতায় অংশ নিয়েছেন। বৃদ্ধাশ্রমের ব্যাপারে মানুষকে অনুৎসাহিত করতে কতবার যে রাস্তায় নেমেছেন তার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু এখন মনে হয় বড্ড ছেলেমানুষি করেছেন সে সময়। এই একা বাড়িতে সবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে তীব্র হতাশায় জীবন কাটানোর চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে অন্যান্য বৃদ্ধার সাথে সময় কাটানোটা হয়ত আনন্দের হবে। অন্তত মন খুলে দুটো কথা তো বলতে পারবেন! সেখানে তো আর কিচেনে প্রিয় কফির মগ নিতে গিয়ে পাশের প্রিয় মানুষটির দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত মগ দেখে বুকটা ধ্বক করে ওঠার পর তীব্র কষ্টে বুক ভারী হয়ে যাবে না। পছন্দের কোনো বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে 'মীরা, তোমার জন্য- শাহেদ' লেখা দেখে গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে উঠবে না। ড্রয়িংরুমের বিশাল দেয়াল জুড়ে টাঙানো ছবিটায় তিন সন্তানকে বুকে জড়িয়ে থাকা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস - এর সাথে চোখের কোণায় জল জমবে না। এসব স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা যে বড্ড কষ্ট! তাই আজকাল তিনি এসব থেকে পালিয়ে বৃদ্ধাশ্রমের কঠিন চারদেয়ালের অনুভূতিহীন জীবনটার প্রতিই বেশি আগ্রহ বোধ করেন।
লেখিকাঃ- নীরা মাজহার